কেন এই পাতা

পানুর ইচ্ছা, লেখক হইবেন । বাঙালি, লেখক না হইতে পারিলে নমো নমো করিয়া পাতের সংস্থান যদি বা হয় জাত রক্ষা হয় না - যথা আঁটকুড়া কুলীন । পানু বিস্তর পরিশ্রম করিলেন । দিস্তা দিস্তা রচনাবলী, অমনিবাস চিবাইলেন । প্রথমে কাব্য টানিয়াছিল, কারণ রস - রসে পাঁউরুটি ভিজিল না । পানু ঘটা করিয়া কিছুদিন রবীন্দ্রসঙ্গীত লিখিলেন (ভেঙ্গেছ দুয়ার এসেছ জ্যোতিরম্যায়, আট হাজার বাষট্টি টাকার দরজা, খর্চা কে দ্যায় ! অথবা, কতবার ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া, চৌমাথার মোড়ে দিব পেন্টুল খুলিয়া) হাউ হাউ করিয়া লোকে মারিতে আসিল । সমস্ত অবজ্ঞা করিয়া পানু লিখিয়া চলিলেন । যদ্যপি পানুর কলমের তোড়ে কাব্যলক্ষী কোঁ কোঁ, সম্পাদকের দপ্তরে চিঁড়া ভিজিল না । অতঃপর পানুর দুঃখে ব্যাবেজ সায়েব কম্পিউটার আবিষ্কার করিলেন । বাজারে ব্লগ আসিল । পানু ব্লগার হইলেন । এই পাতা পানুর পাতা । যা তা ।

Sunday, June 19, 2011

কলি থেকে ফিরে

আলোক সরকার বললেন – “আমি ওই সুধীন্দ্রনাথের কথাটা মানি— আবেগ কবিতার শত্রু” । মানি আমিও, নিতান্ত অবশ্য করে – কিন্তু প্রবলেম হল –যত আবেগ লেখা থেকে ঝেঁটিয়ে তাড়াই-- সব গিয়ে জমা হয় চরিত্রে । ফলে একটা গোটা দিন চোখে যাকে বলে আনন্দাশ্রু-টাশ্রু নিয়ে আবেগে বোকা বোকা কথা বলে গেলাম। প্রতিবার ভাবি, আর নয়, বয়স হচ্ছে-- বয়স হলে কাচা-কোছা ছোট হতে থাকে । ১৩ তারিখ সুদেষ্ণার বাড়িতে বসা হয়েছিল, সুদেষ্ণার ভাই স্বর্ণেন্দু, ভাতৃবধু, ও ভাইপো ভুতুম – যে কী না এক নির্মল জিনিয়াস । সে মহাভারত পুরো জানে । সে জানে অজ্ঞাতবাসে যুধিষ্ঠির, কঙ্ক নামে বিরাট রাজসভায় ... আর তার কত বাহা রে প্রশ্ন – একটাই দোষ – ছেলে বড্ড রোগা । ভুতুমের সাথে ভালো ভাবে আলাপ জমাতে জমাতে এল শুভ্র । খানিক্ষন আড্ডা চলতে চলতেই, নিজেকে আমাদের কাছে নিয়ে এল অনুপম —পিঠে গীটার । আর তার পর ! শুধু গান ! এই অসম্ভব গানের পর আর কবিতা/গদ্য পড়ার কথা মাথায় আসে না-কী ! ডায়েরী খুলে – প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে-- গান । মাঝে সাঝে সুদেষ্ণা, স্বর্ণেন্দুর রচিত প্যারোডি (স্বর্ণেন্দু একজন ভাল গদ্য-লিখিয়েও বটে) । অনুপম একজন অনুপম, অসম্ভব বিনয়ী সারস (নাহ একদম ঢ্যাঙ্গা নয় সে), গানের শুভ্রতায় সারস । কানে এখনো বাজছে “গাইনেশিয়াম”, “গভীরে যাও” । দাদা’রা এ ছেলের স্টকে আরো কত যে ব্লকবাস্টার আছে ! মাঝে দুরন্ত খাওয়া দাওয়া-- সুদেষ্ণা রাত জেগে মুরগী ম্যারিনেট করেছিল না মুরগী সুদেষ্ণাকে সেটা ক্লিয়ার হল না । তবে, ঐ কষা চিকেন খাওয়ার পর ঠিক করেছি – রেসিপিটি জানতেই অইব । ভাঙ্গা মাছের কী একটা পদ ছিল, আমি জানি না, শুভ্র জানে – মানে আমি মাছের শত্রু, মাছ আমার, আর আমি শত্রুর মাংস খাই না । তারপর আবার গান, একদম শেষে সবার অনুরোধে—আমাকে আমার মত-- ৫-টার সময় – অনিচ্ছাসত্ত্বেও উঠে পড়া একটু (গোটা ৬য়েক) রসগোল্লা খেয়ে । উঠে মাণিকতলায় কৌরবের বই দোকান –বইকুন্ঠে – সেখান থেকে বেশ কিছু বই তুলে – কফি হাউস । অনুপমের মাথা ব্যথা ফলে ও বইকুন্ঠ থেকেই বাড়ি । কফি হাউসে দেখা করার কথা ছিল বারীন-দা আর কমল-দার সাথে, কিন্তু সকাল থেকেই পান ভোজনে শরীর বিট্রে করছিল আর মোবাইল ফোনের অকথ্য সার্ভিসে প্ল্যানিং বিগড়ে – কিছছু বুঝতে না পেরে ৮-টায় বাড়ি রওনা দিলাম । মাঝরাস্থায় বারীন-দা জানালো ওঁরা কফি হাউসে । পেছনে অকথ্য জ্যাম-- ফেরা হল না । এক কাঁড়ি আফশোস হল – জানতাম বারীন-দা খিস্তি করবে – ভালোবেসে যতটা খিস্তি করা যায় (ভালোবেসেই সবটা খিস্তি করা যায় আর কী ) । বারীন-দা সরি – কান মুলছি, এক হাট লোকের সামনে এই নিল ডাউন হলাম ।

১৪ তারিখ নতুন সকাল । রাজা রামচন্দ্র রায় বিদ্যালয়ে রক্তদান শিবির চলছিল, বাইরে তখনও রোদ । সুদেষ্ণা আর শুভ্র ভ্যাম্পায়ারের মত ছায়ায় দাঁড়িয়ে ছিল । একত্রে এর পর হালতু । আলোক সরকারের বাড়ি । না না কাজের কথার মধ্যে আড্ডা, বৌদি মিষ্টি দিয়ে যান – সুদেষ্ণার ডায়াবিটিস, তবু মুখ মিষ্টি করতে মিষ্টি খায় । আলোক দা তারমধ্যেই জীবনানন্দ-র কথা বলেন – “জীবনানন্দ আমার অব্যবহিত শত্রু” – নাহ এ’কথার মধ্যে ক্ষুদ্রতা খুঁজতে যাবেন না – এ নিজের একান্ত নিজস্ব লেখা তৈরি করার জন্য, নিজের পথ বেছে নেওয়ার জন্য একমাত্র টোটকা—যার প্রভাব এড়ানো কঠিন মনে হচ্ছে তাকে অস্বীকার কর প্রয়োজন হলে শত্রু বানাও । তা আলোক সরকার সেই কবে থেকেই সফল । পঞ্চাশের “কৃত্তিবাসের” আবেগ, উন্মাদনা, জনপ্রিয়তা-র পাশে, কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই সম্পূর্ণ নিষ্ঠায় কবিতা করে যাওয়া, বাংলা কবিতাকে ক্রমাগত ঋদ্ধ করে যাওয়া আলোক-অলোকের “শতভিষা” আজ বাংলা কবিতার জগতে “কবিতা/পরিচয়” পত্রিকার মতই অন্যতম মূল্যবান । আলোক সরকারের কী পচাশি হল ? এখনো তিনি সমান সচেতন, চারিপাশে নতুন যারা লিখছে তাঁদের লেখার প্রতি দারুণ আগ্রহ । এখনো তিনি নিজের লেখার বদলের কথা ভাবেন । প্রচুর কথা হল রবীন্দ্র গান নিয়ে—একেকটি গান, তাঁদের ব্যাকগ্রাউন্ড, এলেন বুদ্ধদেব বসু, সুধীন দত্ত, বিষ্ণু দে – আমি ৪০-এর কবিদের মধ্যে এই মুহুর্তে আমার একমাত্র ভালো লাগা কবি অমিয় চক্রবর্তীর লেখা নিয়ে নিজের উচ্ছাস প্রকাশ করতে বললেন – হ্যাঁ, অমিয় চক্রবর্তীই হয়ত ঐ জেনারেশানের আজ একমাত্র প্রাসঙ্গিক কবি । আমি কী করলাম ! আবেগে আবারো হাজার বাজে কথা বলে গেলাম ।
বেরোনোর আগে আলোক দা ডাকলেন, সুদেষ্ণা, শুভ্র তখন বৌদির সাথে কথা বলছে । বললেন – “কাল লিখেছি একটা কবিতা, ব্যাপারটা এরকম – একটা নিশ্ছিদ্র হলুদ রঙ, জমাট হয়ে আছে , তার ভেতরে কিছু নেই, মানে শুধু নেই-টুকু আছে, সেটাও তো একটা থাকা – ধরতে পারছ ?” একদম পারি আলোক দা, আপনার ভাষায় – “অভাবের কাছে ফিরি” । কবিতায় আবেগ রাখি না এখানে রাখলাম ।

আলোকদার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এবার বারুইপুর, এবার শুভ্রর বাড়ির দিকে । পথে যে খানটায় চা খেলাম সিগারেট কিনলাম সেখানেই মুখার্জী কুসুম ফুটেছে – শেরউড এস্টেটে রবিন হুড থাকে না, শংকর লাহিড়ী থাকেন । ফ্ল্যাট নং মনে ছিল না, টেলিফোন নাম্বারও ফোন বদলিয়ে হাওয়া । ভেবেছিলাম একবার ঢুঁ মেরে নেব – হল না ।
শুভ্রর বাড়ি পৌঁছেই দেখি, কাকীমা বসে আছেন – বললেন খেতে বসে যাও । ওফ ! সে-কী রান্না ! শুক্তো, পোস্ত চিংড়ি আর সর্ষে-ইলিশ । আমার মাছের সাথে শত্রুতা ছোট বেলা ইস্তক, এখন মাঝে সাঝে বেলে, কাজরী, পাবদা – কিন্তু ইলিশ ! ভয়ংকর ! ছেলেবেলায় ইলিশ খাইনি গন্ধে – তারপর গন্ধ ভাল লেগে যাওয়ায় ঝোল অব্দি দৌড়, কর্ণে শোনা – ব্যাপক কাঁটা । কী ইচ্ছা হল জানি না – চিংড়ি শেষ করে ইলিশে হাত দিলাম আর আহা ! এরকম জিনিস এত বছর উদ্গান্ডুর মত অগ্রাহ্য করে এসেছি ! (আমি বাঙাল তো ছিলামই, এই প্রথম মোহন-বাঙাল) সঙ্গে সঙ্গে ফোন বাড়িতে – বৌ’কে সমাচার । মা, বাবা বেঁচে থাকলে খুশী হত, নিশ্চিত । আঁচিয়ে শুভ্রর ঘরে – প্রথমে বই দেখা – বিশাল কালেকশান ! জমিল সৈয়দ পড়লাম – অপূর্ব লেখা । আর শুভ্রর সবচেয়ে মূল্যবান – যা ভবিষ্যতে মিউজিয়ামে রাখা যায় – উৎপল কুমার বসু-কে উপহার দেয়া কমপক্ষে দশজন বিভিন্ন লেখকের বই – তাঁদের সই বার্তা সমেত, এমন কী দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায়-এর উপহার, সেই বই-এ দেবদুলালের নিজের হাতের নোটস, প্রবুদ্ধ সুন্দর কর, অভিজিৎ মিত্র, ইত্যাদি...। উৎপলের বাড়ির বাইরে ফুটপাথের বইওলার কাছে কেনা । এই মূল্যবান প্রকল্পে সঙ্গী হতে আপনারা নিজের নিজের বই উৎপল বাবুকে উপহার দিতে পারেন – আমরা পরের দিন তা ফুটপাথ থেকে নাম মাত্র দামে কিনে নেব এ গ্যারান্টি দিলাম । আর পেলাম হুলিও কোরতাজ – অসম্ভব ! যে বদমাইশি বুদ্ধিগুলো আসে – ভাবি অভিনব – ১৯৬৫তে বসে ভদ্রলোক সব করে গেছেন, কিচ্ছু বাকী নেই ।

চা খেতে খেতে এরপর শুভ্রর গদ্য । বাইরে মৌসুমি-দি জানান দিচ্ছেন তিনি আসছেন । শুভ্রর ভাষায় সুর্য-দা জাঙ্গিয়া ছেড়ে ওভারকোট পরেছেন । আর ঘরে শুভ্রর গদ্য । শুভ্র বৌদ্ধলেখমালা ফিনিশ করে, গদ্যে হাত দিয়েছে, একসাথেই চলছে দুটি গদ্য (তার মধ্যে একটি উপন্যাস, হাতে লেখা, একটা শব্দও কাটাকুটি নেই-- ভাবা যায় ! আর কেমন গদ্য ! হলফ করে বলতে পারি—এই গদ্য লেখার পাটা খুব কমের-- বাঙালির শুধু নয়, পৃথিবীর । এরি মাঝে শমিতের ফোন আর আমাদের অনেক আফশোস দেখা না হওয়ার । আবার গদ্য ! ওহ অনবদ্য ।

মণীন্দ্র গুপ্তর সাথে দেখা করার ছিল – হল না । দেবারতি-দি (মিত্র) একটু অসুস্থ , মনীন্দ্র বাবু তাঁকে নিয়ে ডাক্তার দেখাতে ।

৫টার দিকে আমি আর সুদেষ্ণা ফেরার রাস্তায় । আমাকে কল্যানী ফিরতে হবে, সুদেষ্ণা সিঁথি মোড় । গোটা রাস্তা চুপচাপ, আবার কবে একসাথে আমরা সবাই ! রাস্তায় এগরোল
তারপর শিয়ালদহ ।

১৫ তারিখ সাগরনীলের সাথে বসার ছিল আর এক অম্লান বন্ধুর সাথে ! হল না – এ যাত্রায় । আফশোস ! আফশোস !

1 comment:

  1. হ্যাঁ, সেদিন আমরা শেরউডের ধারে চা-সিগারেটে। একটা পথ ধরে তো এগোতেই হয়। তাই আমরাও একটা পথ ধরলাম। তারপর টালিনালার অনবদ্য কচুরিপানা কাটিয়ে মৌসুমিদিকে সঙ্গে নিয়ে সোজা.........

    ReplyDelete